চীনের ‘রোবট অলিম্পিক’-এ দাপট, মানব অ্যাথলেটদের রেকর্ডও ছাড়াচ্ছে হিউম্যানয়েড

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : চীনে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক ওয়ার্ল্ড হিউম্যানয়েড রোবট গেমস ঘিরে হিউম্যানয়েড রোবট প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির চিত্র সামনে এসেছে। প্রতিযোগিতার বিভিন্ন ইভেন্টে চীনা দলগুলোর আধিপত্যের পাশাপাশি দৌড়, ফুটবলসহ নানা ক্ষেত্রে রোবটের সক্ষমতা ক্রমেই বাড়ছে।

গত এক দশকে চীনে রোবট প্রতিযোগিতা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শখের নির্মাতাদের ছোট পরিসরের আয়োজন থেকে বড় রাষ্ট্রীয় ও বাণিজ্যিক প্রদর্শনীতে পরিণত হয়েছে। এর পেছনে সরকারি সহায়তা, গবেষণায় বিনিয়োগ এবং উৎপাদন খরচ কমে আসাকে বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

গবেষণাগার থেকে বাস্তব প্রয়োগে

২০১৫ সালে বেইজিংয়ে প্রথম ওয়ার্ল্ড রোবট কনফারেন্স আয়োজনের মাধ্যমে রোবোটিকস চীনের জাতীয় অগ্রাধিকারের একটি খাতে পরিণত হয়। এরপর প্রযুক্তি দ্রুত এগোতে থাকে। ২০২৩ সালের মধ্যে রোবট প্রদর্শনী শুধু গবেষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বাণিজ্যিক পণ্যের বাস্তব প্রয়োগ দেখানোর ক্ষেত্রেও পরিণত হয়।

চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর কম খরচে রোবট তৈরির সক্ষমতাও এ ক্ষেত্রে বড় সুবিধা তৈরি করেছে। এর একটি উদাহরণ শাওমির রোবট কুকুর ‘সাইবারডগ’, যার দাম ছিল প্রায় ১ হাজার ৫০০ ডলার। তুলনায় বোস্টন ডায়নামিকসের ‘স্পট’-এর দাম ছিল ৭৫ হাজার ডলারের বেশি।

এক বছরেই দৌড়ে বড় অগ্রগতি

২০২৫ সালের বেইজিং হাফ ম্যারাথনে হিউম্যানয়েড রোবটদের অংশগ্রহণে প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়েছিল। অনেক রোবট দৌড় শুরুর পর পড়ে যায় কিংবা কয়েক মিটার এগিয়ে বাধায় ধাক্কা খায়।

কিন্তু মাত্র এক বছরের মধ্যে চিত্র অনেকটাই বদলে যায়। পরবর্তী প্রতিযোগিতায় ইউনিট্রির ‘এইচ১’ রোবট মানুষের সহায়তা ছাড়াই দৌড় শেষ করার সক্ষমতা দেখায়। ২০২৬ সালের প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া শতাধিক দলের মধ্যে ৪৭টি রোবট দৌড় শেষ করেছে বলে জানিয়েছে চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম।

বোল্টের রেকর্ডও ছাড়িয়ে গেল রোবট

সবচেয়ে চমকপ্রদ ঘটনা ঘটেছে ১০০ মিটার দৌড়ে। চীনা প্রতিষ্ঠান অনারের তৈরি ‘লাইটনিং’ নামের হিউম্যানয়েড রোবট ৯ দশমিক ৩২ সেকেন্ডে ১০০ মিটার দৌড়েছে বলে জানিয়েছে সিসিটিভি। এই সময় ২০০৯ সালে উসাইন বোল্টের ৯ দশমিক ৫৮ সেকেন্ডের বিশ্বরেকর্ডের চেয়েও দ্রুত।

এ ছাড়া অনারের আরেক হিউম্যানয়েড রোবট ‘ফ্ল্যাশ’ ৫০ মিনিট ২৬ সেকেন্ডে হাফ ম্যারাথন শেষ করেছে। ফলে মানুষের মতো শারীরিক সক্ষমতা অর্জনের ক্ষেত্রে রোবট প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

এবার গুরুত্ব পাচ্ছে রোবটের ‘হাত’

২০২৬ সালের প্রতিযোগিতায় নতুন করে যুক্ত হয়েছে হাতের দক্ষতা যাচাইয়ের বিভিন্ন ইভেন্ট। স্ক্রু শক্ত করে লাগানো, বোতল খোলা কিংবা চিমটি দিয়ে ছোট পুঁতি তোলার মতো সূক্ষ্ম কাজ করতে দেওয়া হচ্ছে রোবটকে।

বিশ্লেষকদের মতে, মানুষের মতো নিখুঁতভাবে বিভিন্ন বস্তু ধরতে ও ব্যবহার করতে সক্ষম রোবটের হাত তৈরি করাই হিউম্যানয়েড প্রযুক্তির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। একই সঙ্গে প্রতিযোগিতার এসব বাস্তব কাজের মাধ্যমে রোবটের প্রোটোটাইপগুলো বাস্তব জীবনে কতটা কার্যকর হতে পারে, সেটিও যাচাই করা হচ্ছে।

চীন ২০২১ সালের পাঁচ বছর মেয়াদি রোবোটিকস পরিকল্পনায় ভর্তুকি, গবেষণায় করছাড় ও অর্থায়নের মাধ্যমে দেশটিকে রোবট প্রযুক্তির বৈশ্বিক উদ্ভাবনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল। বর্তমানের প্রতিযোগিতাগুলো সেই উচ্চাকাঙ্ক্ষার বাস্তব অগ্রগতিরই একটি চিত্র তুলে ধরছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *