সিঁড়ি বন্ধ থাকায় ময়মনসিংহ মেডিক্যালে আগুনের পর ভয়াবহ হুড়োহুড়ি, ৪ জনের মৃত্যু

নিজস্ব প্রতিনিধি: ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের নতুন ভবনে অগ্নিকাণ্ডের পর রোগী ও স্বজনদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ভবনটির অষ্টম তলা থেকে বের হওয়ার জন্য পাঁচটি সিঁড়ি থাকলেও আগুন লাগার সময় চারটিই বন্ধ ছিল। ফলে নিচে নামতে গিয়ে অনেকেই সিঁড়ির পথ খুঁজে না পেয়ে আরও আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। এ সময় সৃষ্ট হুড়োহুড়ি ও পদদলনে হতাহতের ঘটনা ঘটে বলে স্থানীয় বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।

আগুনের সময় ভবনে থাকা জামালপুরের এক নারী জানান, তিনি ছয়তলা থেকে নিচে নামার চেষ্টা করে দেখেন, যে দিকেই যাচ্ছেন সিঁড়ি বন্ধ। দীর্ঘ সময় ছোটাছুটি করার পর তিনি বের হওয়ার পথ খুঁজে পান।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নিরাপত্তার কারণে একটি সিঁড়ি খোলা রেখে বাকি চারটি বন্ধ রাখা হয়। তাদের দাবি, মাদকসেবী ও চোরের উপদ্রবের কারণে সারা বছরই চারটি সিঁড়ি বন্ধ রাখা হয়।

ফায়ার সার্ভিস, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সূত্রে জানা যায়, সোমবার সন্ধ্যার কিছু আগে নতুন ভবনের অষ্টম তলায় হঠাৎ ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা যায়। মুহূর্তেই ভবনের রোগী ও স্বজনদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। আগুনের খবর পেয়ে রোগীদের নিয়ে দ্রুত নিচে নামার চেষ্টা করলে বিভিন্ন তলায় হুড়োহুড়ি শুরু হয়। এতে বেশ কয়েকজন আহত হন।

এদিকে, হতাহতের সংখ্যা নিয়ে শুরু থেকেই বিভ্রান্তি দেখা দেয়। ময়মনসিংহ জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, হাসপাতালের জরুরি বিভাগে খোঁজ নিয়ে হুড়োহুড়িতে এক শিশুসহ ছয়জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তখন দাবি করে, পদদলিত হয়ে কারও মৃত্যু হয়নি।

সোমবার রাতে ময়মনসিংহ-৪ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য আবু ওয়াহাব আকন্দ এবং ময়মনসিংহ বিভাগীয় কমিশনার এস এম হুমায়ুন কবীরও সাংবাদিকদের জানান, মৃত্যুর খবরটি সঠিক নয়।

হাসপাতালের উপপরিচালক জাকিউল ইসলাম বলেন, পদদলিত হয়ে কেউ মারা যাননি। ওই সময় দুজনের স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে।

আগুনের কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত কমিটি

অগ্নিকাণ্ডের কারণ এবং মৃত্যুর ঘটনা তদন্তে সোমবার রাতেই পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের প্রধান ডা. গোলাম রহমানকে কমিটির প্রধান এবং সহকারী পরিচালক মাঈনউদ্দিন খানকে সদস্যসচিব করা হয়েছে।

কমিটিতে ফায়ার সার্ভিসের একজন কর্মকর্তা, গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী এবং বিদ্যুৎ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীকে সদস্য করা হয়েছে।

কমিটির সদস্যসচিব মাঈনউদ্দিন খান জানান, তদন্ত কমিটি ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছে। তিন কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে।

স্থানীয় সূত্রে চারজনের মৃত্যুর তথ্য

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পদদলনে মৃত্যুর ঘটনা অস্বীকার করলেও স্থানীয় সূত্রে মঙ্গলবার চারজনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার কথা জানা গেছে।

নিহতরা হলেন—তারাকান্দার বালিখা গ্রামের কুলসুমা (৩৫), নেত্রকোনার পূর্বধলা উপজেলার হাজেরা (৫০), ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার পল্লী চিকিৎসক শাহজাহান এবং একই উপজেলার নির্মাণশ্রমিক রমজান।

মাকে হারালেন মীম, পদদলন থেকে ভাইকে উদ্ধার

তারাকান্দার বালিখা গ্রামের কুলসুমার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মঙ্গলবার সকাল ১০টায় তার দাফন সম্পন্ন হয়েছে। তার মৃত্যুতে পরিবার ও স্বজনদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

কুলসুমার মেয়ে মীম আক্তার (১৮) জানান, তার ১২ বছর বয়সী ভাই স্বাধীন জন্ডিসে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ছিল। তিনি ও তার মা ছেলের সঙ্গে হাসপাতালে ছিলেন।

আগুনের খবর পাওয়ার পর কুলসুমা অসুস্থ ছেলেকে নিয়ে মীমসহ সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে শুরু করেন। কয়েক ধাপ নামার পরই সিঁড়িতে তীব্র হুড়োহুড়ি শুরু হয়। একপর্যায়ে তারা পড়ে গেলে একের পর এক মানুষ তাদের ওপর দিয়ে যেতে থাকেন।

মীম জানান, তিনি কোনোভাবে পদদলন থেকে বেরিয়ে আসতে পারলেও মাকে বের করতে পারছিলেন না। কয়েকবার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। পরে ভিড় কিছুটা কমলে দুই পুরুষের সহায়তায় মাকে একটি মাদুরে করে ভবন থেকে বের করে জরুরি বিভাগে নেওয়া হয়। এরপর হাসপাতালের পুরোনো ভবনের একটি ওয়ার্ডে নেওয়া হলে চিকিৎসক কুলসুমাকে মৃত ঘোষণা করেন।

স্থানীয় সূত্রে আরও জানা গেছে, আগুনের পর ভবন থেকে নামতে গিয়ে আহত হয়ে ফুলবাড়িয়ার বিন্দানন্দ গ্রামের নির্মাণশ্রমিক রমজান এবং শিবরামপুর গ্রামের পল্লী চিকিৎসক শাহজাহান মারা যান। মঙ্গলবার বিকেল ৩টায় নিজ নিজ গ্রামে তাদের জানাজা ও দাফন সম্পন্ন হয়েছে।

অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ, নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের পরই আরও স্পষ্ট হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *