লেবাননের ‘মডেল টাউন’ ঘিরে ইসরায়েলি সেনা,চলছে ড্রোন হামলা

ছবি সংগৃহীত
অনলাইন ডেস্ক :

 

দক্ষিণ লেবাননে নিজের বাড়ির মেঝেতে ছড়িয়ে থাকা ভাঙা কাচ এড়িয়ে বারান্দায় বেরিয়ে এলেন মারিয়াম আল-ইয়াগি। এরপর তিনি দূরে আঙুল তুলে দেখালেন।

কয়েক শ মিটার দূরে তখনও দেখা যাচ্ছিল এমন এক দৃশ্য, যার সঙ্গে ৬৭ বছর বয়সী এই নারী এখন অভ্যস্ত। পাশের লেবানিজ গ্রামে সামরিক যান চলাচল করছে। গ্রামটি এখনো ইসরায়েলি সেনাদের দখলে।

রয়টার্স জানায়, রাতে ইসরায়েলি সেনারা ইয়াগির পশ্চিম জাওতার এলাকার বাড়ির এত কাছ দিয়ে টহল দেয় যে তিনি তাদের কথা শুনতে পান।

দিনের বেলায় বাগানে কাজ করার সময়ও প্রায়ই একটি ছোট ইসরায়েলি নজরদারি ড্রোন তাকে অনুসরণ করে।

সকালজুড়ে আশপাশের দখল করা শহরগুলোতে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। ইসরায়েলি সেনারা নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণ ও বুলডোজার ব্যবহার করে সেখানকার বাড়িঘর ধ্বংস করছে।

ইয়াগি রয়টার্সকে বলেন, ‘ওই টালির ছাদওয়ালা বাড়িটা থেকে আমরা সব সময় তাদের শব্দ শুনতে পাই।

তারা চিৎকার করে কথা বলে, ট্যাংক এদিক-ওদিক চলাচল করে। আমরা সবই শুনতে পাই। তারা আমাদের খুব কাছেই আছে। কিন্তু আমরা এখানে বসে আছি, আমরা ভয় পাই না। কখনোই না।

জুলাইয়ে ইসরায়েলি সেনারা পশ্চিম জাওতার থেকে সরে যায়। দক্ষিণ লেবানন থেকে ইসরায়েল ধাপে ধাপে সেনা সরিয়ে নেবে—যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে নেওয়া এমন একটি পরিকল্পনার প্রথম পরীক্ষা ছিল এটি। এর বিনিময়ে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করার কথা রয়েছে।

তবে এর দুই মাস পরও আর কোনো ‘পরীক্ষামূলক অঞ্চল’ নিয়ে চুক্তি হয়নি। পশ্চিম জাওতারের বাসিন্দারাও বলছেন, তাদের গ্রামকে কোনো আদর্শ উদাহরণ হিসেবে দেখা যায় না। রয়টার্সের প্রশ্নের জবাবে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী বলেছে, হিজবুল্লাহর অস্ত্রের হুমকি পুরোপুরি দূর করার কাজ এখনো শেষ হয়নি। হুমকি শনাক্ত করতে ড্রোন ব্যবহার করা হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের চলাচলে বিধিনিষেধও সেনাদের নিরাপত্তার জন্য দেওয়া হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের এক মুখপাত্র বলেন, লেবানন ও ইসরায়েল—দুই দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য পরীক্ষামূলক অঞ্চল তৈরির প্রক্রিয়াই ‘একমাত্র কার্যকর পথ’।

লেবাননের সেনাবাহিনী প্রাথমিক ওই অঞ্চলে অভিযান চালিয়ে হুমকি দূর করার পর অঞ্চলটি আরো বড় করা হবে। আর হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করা ‘এই প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ’।

সাত মাস আগে ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের পাশাপাশি লেবাননে বিমান হামলা ও স্থল অভিযান শুরু করে। এর পর হিজবুল্লাহ তেহরানের প্রতি সংহতি জানিয়ে ইসরায়েলে হামলা চালায়। সেই সময় ১০ লাখের বেশি লেবানিজ মানুষ নিজেদের বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়ে যান।

লেবানন যুদ্ধের অবসান ঘটানো ছিল যেকোনো শান্তিচুক্তির জন্য ইরানের অন্যতম শর্ত। এ কারণে যুক্তরাষ্ট্রও একটি চুক্তির জন্য চাপ দিতে থাকে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যে কয়েক মাস ধরে আলোচনা এবং জুনে যুদ্ধবিরতি হলেও ইসরায়েলি সেনাবাহিনী প্রাণঘাতী হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।

ইসরায়েলি সেনারা এখনো নিজেদের ঘোষিত একটি নিরাপত্তা অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ওই অঞ্চলের মধ্যে লেবাননের কয়েক ডজন গ্রাম রয়েছে। এসব গ্রামের অনেকগুলোই ইসরায়েলি সেনারা ধ্বংস করে দিয়েছে। পশ্চিম জাওতারের বাসিন্দারা বলেন, জুলাইয়ে বাড়িতে ফিরে আসার অনুভূতি ছিল মিশ্র। বাড়িতে ফিরতে পেরে তারা খুশি ছিলেন। কিন্তু ফিরে এসে দেখেন, অনেক বাড়িঘর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। আর ইসরায়েলি সেনারাও খুব কাছেই অবস্থান করছে।

ইয়াগির বাড়ির ওপরের তলায় একটি ট্যাংকের গোলা আঘাত করেছিল। এতে বাড়ির সব জানালা ভেঙে যায়। আরেকটি গোলা তার পানির ট্যাংকের ছাদ ভেদ করে। এতে ট্যাংকের পানি রক্তের মতো লাল হয়ে যায়। বাড়ি মেরামতে অনেক টাকা লাগবে। তাই আপাতত মেরামতের কাজ পিছিয়ে দিয়েছেন ইয়াগি।

তিনি বলেন, ‘কাচ নেই বলে আমরা কার্ডবোর্ড আর এ ধরনের জিনিস দিয়ে জানালা ঢেকেছি। আমার আরেক ছেলের বাড়িরও সব কাচসহ সবকিছু নষ্ট হয়ে গেছে। কিন্তু আমরা এখানেই আছি। যত দিন না তারা এখান থেকে পুরোপুরি চলে যায়।’ এ সময় পাশের গ্রামে থাকা ইসরায়েলি সেনাদের দিকে ইঙ্গিত করেন তিনি।

ইয়াগির প্রতিবেশীদের খুব কমসংখ্যকই এখন পর্যন্ত বাড়িতে ফিরেছেন। কারণ তাদের বাড়িঘর পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। ইয়াগির বাগানের ভেতর দিয়ে ট্যাংকের চাকার দাগ দেখা যাচ্ছিল। কয়েক দশক ধরে যত্ন করে বড় করা জলপাই গাছগুলো উপড়ে পড়ে আছে। এখন জলপাই সংগ্রহের মৌসুম শুরু হয়েছে। বাগানে যা কিছু বাকি আছে, সেগুলো সংগ্রহ করতে পেরে ইয়াগি উচ্ছ্বসিত।

ইসরায়েলি সেনাদের অবস্থানের কাছে যেসব জলপাই বাগান রয়েছে, সেসব বাগানের মালিকেরা বলেছেন, গাছের কাছে যাওয়ার অনুমতি চাওয়া হয়েছে। এ জন্য লেবানন ও ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে থাকা সমন্বয় ব্যবস্থার মাধ্যমে আবেদন করা হয়েছে। কেউ কেউ জলপাই সংগ্রহ করতে ওয়াশিংটনের কাছে অনুমতি চাইতে হওয়াকে হাস্যকর বলে ঠাট্টা করেছেন। আবার কেউ আশঙ্কা করছেন, অনুমতি আসতে আসতে জলপাই সংগ্রহের সময় শেষ হয়ে যাবে।

পশ্চিম জাওতার থেকে কিছুটা দূরেই রয়েছে এর পাশের গ্রাম পূর্ব জাওতার। গ্রামটি এখনো ইসরায়েলি সেনাদের দখলে। তারা সেখানে নিয়মিতভাবে বাড়িঘর ধ্বংস করছে। পূর্ব জাওতার থেকে বাস্তুচ্যুত বাসিন্দারা পশ্চিম জাওতারে এসে আশ্রয় নিয়েছেন। গ্রামের প্রধান চত্বরে সাদা প্লাস্টিকের চেয়ারে বসে তারা নিজেদের বাড়িঘরের দিকে তাকিয়ে থাকেন। মাঝখানে রয়েছে জলপাই বাগান ও কৃষিজমি দিয়ে ঘেরা একটি ছোট উপত্যকা। সেখান থেকে নিজেদের গ্রামের ধ্বংসযজ্ঞ তারা খুব কাছ থেকে দেখতে পাচ্ছেন।

এক ব্যক্তি রয়টার্সকে বলেন, গত তিন সপ্তাহ ধরে তিনি নিজের বাড়িতে আলো জ্বলতে দেখেছেন। তার ধারণা, ইসরায়েলি সেনারা বাড়িটি ধ্বংস করার জন্য সেখানে বিস্ফোরক বসাচ্ছে।

পশ্চিম জাওতারের মেয়র আবেদ এজেদ্দিন রয়টার্সকে বলেন, ‘পরীক্ষামূলক অঞ্চল’ কর্মসূচি সফল হয়নি। এর প্রধান কারণ হলো বিদ্যুৎ ও পানির মতো প্রয়োজনীয় সরকারি সেবাগুলো এখনো বেশির ভাগ ক্ষেত্রে চালু হয়নি। এজেদ্দিন বলেন, ‘নীতিগতভাবে আমি বলতে পারি, না, এটি সফল হয়নি। আমাদের যা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তা হলো পশ্চিম জাওতার একটি পরীক্ষামূলক অঞ্চল হিসেবে আদর্শ গ্রাম হবে।’

প্রায় ৭০টি পরিবার পশ্চিম জাওতারে ফিরে এসেছে। তাদের বেশির ভাগই বাড়ির যেসব অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি, সেখানেই বসবাস করছে। অনেকের কাছে অন্য জায়গায় ভাড়া দিয়ে থাকা বা বাস্তুচ্যুতদের আশ্রয়কেন্দ্রে থাকার চেয়ে এটিই ভালো বিকল্প। লেবানন সরকারের দক্ষিণাঞ্চল বিষয়ক পরিষদ এমন ১৬টি তৈরি করা ঘর দিয়েছে, যেসব পরিবারের বাড়িতে বসবাস করা সম্ভব নয়।

তবে এসব তৈরি করা ঘরের বেশির ভাগই এখনো খালি পড়ে আছে। কারণ সেখানে বিদ্যুৎ ও পানির ব্যবস্থা নেই। সরকারি কর্মীরা বিদ্যুতের লাইন বাড়ানোর কাজ শুরু করেছেন। তবে তাদের নতুন একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র পর্যন্ত লাইন নিতে হচ্ছে। কারণ গ্রামের পুরোনো বিদ্যুৎ সংযোগটি পূর্ব জাওতারের ভেতর দিয়ে গেছে।

এজেদ্দিন বলেন, ‘কিছুক্ষণের মধ্যেই ড্রোনটি হয়তো গ্রামের প্রধান চত্বরে থাকা মানুষের ওপর দিয়ে উড়বে। এটি কাউকেই একা থাকতে দিচ্ছে না।’ কথা শেষ হওয়ার কিছুক্ষণ পরই একটি ছোট নজরদারি ড্রোন এজেদ্দিন ও রয়টার্সের সাংবাদিক দলের ওপর দিয়ে উড়ে যায়। ধীরে ধীরে নিচে নেমে সেটি মাটি থেকে মাত্র কয়েক মিটার ওপরে চলে আসে। কয়েক মিনিট সেটি সেখানে ভেসে থাকে। এরপর পাশের দখল করা গ্রামের দিকে উড়ে যায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *