অনলাইন ডেস্ক: মানুষ সাধারণত সম্পদ অর্জনের পর তা ধরে রাখার চিন্তায় ব্যস্ত থাকে। সম্পদ বাড়লে স্বস্তির বদলে অনেক সময় হারানোর ভয় বাড়ে। কিন্তু সাহাবায়ে কেরামের জীবনে সম্পদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাঁরা সম্পদকে জীবনের লক্ষ্য মনে করতেন না; বরং আল্লাহর দেওয়া আমানত মনে করতেন। তাই সম্পদ যত বাড়ত, আল্লাহর কাছে এর হিসাব দেওয়ার চিন্তাও তাঁদের অন্তরে তত গভীর হতো।
এই বিরল মানসিকতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ছিলেন মহান সাহাবি তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ (রা.)।
তিনি ছিলেন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ঘনিষ্ঠ সাহাবি, জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত দশ সাহাবির অন্যতম এবং অসাধারণ দানশীলতার জন্য প্রসিদ্ধ। তাঁর জীবনে সম্পদের প্রাচুর্য ছিল, কিন্তু সম্পদের মোহ ছিল না। বরং বিপুল সম্পদই তাঁকে ভাবিয়ে তুলত—‘আল্লাহ আমাকে এত কিছু দিয়েছেন, এর হিসাব আমি কীভাবে দেব?’ একদিন তালহা (রা.)-কে বেশ চিন্তিত ও মনমরা দেখে একজন জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনাকে এত চিন্তিত দেখাচ্ছে কেন? পারিবারিক কোনো সমস্যা হয়েছে?’ তিনি বললেন, ‘না, পারিবারিক কোনো সমস্যা নয়। আমার চিন্তা সম্পদ নিয়ে।
তাঁর দাদি তখন বললেন, ‘যে সম্পদ তোমাকে চিন্তিত করে তুলেছে, তা-ই যদি দান করে দাও, তাহলে তো তোমার দুশ্চিন্তা দূর হয়ে যাবে।’ দাদির কথাটি তালহা (রা.)-এর হৃদয়ে গভীরভাবে রেখাপাত করল। তিনি তাঁর দাসীকে নির্দেশ দিলেন, তাঁর সম্পদ একত্র করতে এবং অভাবী মানুষদের খুঁজে বের করতে। হিসাব করে দেখা গেল, তাঁর কাছে বিপুল পরিমাণ সম্পদ রয়েছে। বর্ণিত আছে, সে সময় তাঁর সম্পদের পরিমাণ ছিল প্রায় চার লাখ দিরহাম।
তিনি তা আল্লাহর পথে বিলিয়ে দিলেন। কেননা রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘দান করলে সম্পদ কমে না’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৫৮৮)
আরেকবারের ঘটনা। তালহা (রা.) তাঁর একটি জমি উসমান ইবনে আফফান (রা.)-এর কাছে বিক্রি করেন। জমিটির মূল্য ছিল সাত লাখ দিরহাম। এত বিপুল অর্থ হাতে আসার পরও তালহা (রা.) আনন্দে আত্মহারা হয়ে যাননি। বরং তাঁর অন্তরে অন্য চিন্তা জেগে উঠল। এত বিপুল অর্থ একজন মানুষের ঘরে থাকা কি তাঁর জন্য স্বস্তির বিষয় হতে পারে? তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, এই অর্থ নিজের কাছে জমিয়ে রাখবেন না। তাঁর খাদিমকে নির্দেশ দিলেন, রাত শেষ হওয়ার আগেই যেন অর্থগুলো মদিনার মানুষের মধ্যে বিতরণ করে দেওয়া হয়। রাত পেরিয়ে ভোর হলো। খাদিম এসে জানালেন, তাঁর কাছে আর একটি দিরহামও অবশিষ্ট নেই। মদিনার রাস্তায় যাঁদের প্রয়োজন দেখা গেছে, তাঁদের মধ্যে অর্থ বিতরণ করে দেওয়া হয়েছে। এটাই ছিল তালহা (রা.)-এর সম্পদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি—যত বেশি আসবে, তত বেশি মানুষের কল্যাণে ব্যয় হবে।
তালহা (রা.)-এর দানশীলতা এতটাই প্রসিদ্ধ ছিল যে মানুষ তাঁর দানের পরিমাণ দেখে বিস্মিত হতো। কাবিসা ইবনে জাবির (রহ.) তাঁর সম্পর্কে বলেছেন, তিনি তালহা (রা.)-এর মতো কাউকে এত বেশি সম্পদ দান করতে দেখেননি। তালহা (রা.) শুধু নিজের পরিচিত দরিদ্রদের সাহায্য করতেন না; তিনি মানুষের ঋণের খোঁজও রাখতেন। আত্মীয়স্বজন কিংবা আশপাশের কেউ ঋণগ্রস্ত কি না, তা জানতে চেষ্টা করতেন। কারও ঋণের কথা জানতে পারলে নিজের সম্পদ দিয়ে তা পরিশোধ করে দিতেন।
বর্ণিত আছে, সুবাইহা আত-তাইমি নামের এক ব্যক্তি ৩০ হাজার দিরহাম ঋণগ্রস্ত ছিলেন। তালহা (রা.) তাঁর ঋণের কথা জানতে পেরে সেই ঋণ পরিশোধ করে দেন। এ ছাড়া তিনি উম্মুল মুমিনিন আয়িশা (রা.)-কেও নিয়মিত উপহার পাঠাতেন। বর্ণনায় এসেছে, তিনি প্রতিবছর তাঁর বার্ষিক আয়ের মধ্য থেকে ১০ হাজার দিরহাম আয়িশা (রা.)-এর জন্য নির্ধারণ করে দিতেন।
তালহা (রা.) শুধু দানশীলই ছিলেন না; তিনি ছিলেন সফল ব্যবসায়ীও বটে। তাঁর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বড় একটি অংশ ছিল ইরাককেন্দ্রিক কৃষি ও ব্যবসাকে ঘিরে। জীবনীগ্রন্থের কিছু বর্ণনায় তাঁর দৈনিক আয় এক হাজার দিরহাম পর্যন্ত হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এত বিপুল আয় থাকা সত্ত্বেও সম্পদ তাঁর হৃদয়কে বন্দী করতে পারেনি। অদ্ভুত বিষয় হলো, এত বিপুল অর্থ দান করার পরও তালহা (রা.) মৃত্যুর সময় অঢেল সম্পদ রেখে যান। কিছু ঐতিহাসিক বর্ণনায় তাঁর রেখে যাওয়া নগদ সম্পদের পরিমাণ ২০ লাখ দিনার ও তিন কোটি দিরহাম পর্যন্ত উল্লেখ করা হয়েছে।
এই সংখ্যাগুলোকে শুধু টাকা-পয়সার অঙ্ক দিয়ে দেখলে বিষয়টির গভীরতা হয়তো উপলব্ধি করা কঠিন। এভাবে হজরত তালহা (রা.)-এর জীবন আমাদের সম্পদের সঠিক ব্যবহার শেখায়। তালহা (রা.)-এর হাতে বিপুল সম্পদ ছিল, কিন্তু হৃদয়ে ছিল আল্লাহর ভয়। তিনি সম্পদ উপার্জন করেছেন, আবার অকাতরে দানও করেছেন। মানুষের প্রয়োজন মিটিয়েছেন, ঋণগ্রস্তকে ঋণমুক্ত করেছেন, আত্মীয়স্বজনের পাশে দাঁড়িয়েছেন এবং আল্লাহর দেওয়া নিয়ামতের যথাযথ ব্যবহার করেছেন।
আল্লাহ তাআলা মুসলমানদের অঢেল সম্পদের মালিক বানান এবং সঠিকভাবে সম্পদ ব্যবহারের তাওফিক দান করুন। আমিন।