অনলাইন ডেস্ক : যুক্তরাজ্যের রয়্যাল এয়ারফোর্স বা আরএএফ ফেয়ারফোর্ড বিমানঘাঁটিতে ‘হুমকির’ মুখে সেখান থেকে নিজেদের বোমারু বিমানগুলো সরিয়ে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। গত রবিবার ওই বিমানঘাঁটি থেকে নিজেদের বিমানগুলো যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব ঘাঁটিতে ফিরিয়ে নেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর (পেন্টাগন)।
সরিয়ে নেওয়া এসব বিমানের মধ্যে প্রায় এক ডজন বি-১ বোমারু বিমান রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই এ তথ্য জানিয়েছেন। হোয়াইট হাউসের বাইরে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হওয়া ট্রাম্পের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, কোনো ‘সুনির্দিষ্ট হুমকি’র কারণেই যুক্তরাষ্ট্র বিমানঘাঁটি থেকে বোমারু বিমানগুলো প্রত্যাহার করেছে কি না। জবাবে তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ, আমি মনে করি, আমরা তা বলতে পারি।
এগুলো তো আর দুর্ঘটনাবশত উড়ে চলে যায়নি।’
ট্রাম্প আরো বলেন, ‘সেখানে কিছু হুমকি ছিল। শত্রুকে প্রলুব্ধ করার চেয়ে তাদের বন্দি করা এবং পরাস্ত করাই আমাদের লক্ষ্য। কিন্তু শুধু শুধু আমরা বিমানগুলোকে কেন ওখানে ফেলে রাখব? তাই আমরা সেগুলোর অবস্থান কিছুটা বদলেছি।
খুব বেশি দূরে নেওয়া হয়নি।’
তবে ওয়াশিংটন প্রকৃতপক্ষে কারা এ হুমকি দিয়েছে ‘তাদের চেনে’ উল্লেখ করলেও সুনির্দিষ্ট করে কিছু জানাননি মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
গত বছরের জুনে রাশিয়ার পাঁচটি ঘাঁটিতে ইউক্রেনের চালানো গোপন ড্রোন হামলা বা ‘অপারেশন স্পাইডারওয়েবের’ উদাহরণ টেনে হোয়াইট হাউসের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র বলেন, শত্রুপক্ষ দূর থেকেও কতটা বড় ক্ষতি করতে পারে, এটি তারই প্রমাণ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই সূত্রটি আরো জানায়, বিষয়টি যা-ই হোক, এটিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গেই বিবেচনা করা হয়েছে।
এর আগে এদিনই যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় অর্থাৎ ডাউনিং স্ট্রিটের একজন মুখপাত্র আরএএফ ফেয়ারফোর্ড ঘাঁটিটি সম্পূর্ণ নিরাপদ বলে দাবি করেন।
এ সময় তিনি গত সপ্তাহে এই ঘাঁটি প্রসঙ্গে যুক্তরাজ্যের ‘পুলিশ, প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর’ প্রশংসা করে দেওয়া ট্রাম্পের বক্তব্যের দিকেও ইঙ্গিত করেন।
তবে ট্রাম্পের সর্বশেষ মন্তব্য মার্কিন গণমাধ্যমের সেই খবরগুলোকেই নিশ্চিত করছে, যেখানে বলা হয়েছিল, গত ২৭ সেপ্টেম্বর ওই বিমানঘাঁটির কাছে তিনটি ‘সন্দেহভাজন যান’ নিয়ে পুলিশ তৎপর হওয়ার পর একটি বড় ধরনের ঘটনা ঘটে। আর সেই নতুন হুমকির জের ধরেই বোমারু বিমানগুলো সরিয়ে নেওয়া হয়।
এদিকে আরএএফ ফেয়ারফোর্ড ঘাঁটি থেকে মার্কিন বিমান সরিয়ে নেওয়ার সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো পরিষ্কার নয়। তবে ওয়াশিংটনের একাধিক সূত্র বিবিসির কাছে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে যে বিমানগুলোর ওপর কোনো অন্তর্ঘাতমূলক হামলা কিংবা ইরানের সঙ্গে নতুন করে সংঘাত শুরু হলে এ সংবেদনশীল ও অত্যন্ত ব্যয়বহুল যুদ্ধবিমানগুলো টার্গেট করার পরিকল্পনা করা হয়ে থাকতে পারে।
প্রতিরক্ষাবিষয়ক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ‘রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের’ গবেষণা বিশ্লেষক ক্রিস্টফ বার্গস বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, ফেয়ারফোর্ড থেকে বিমান সরিয়ে নেওয়ায় ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের দ্রুত আকাশপথে হামলা চালানোর সক্ষমতা কিছুটা কমবে, যা সামগ্রিক উত্তেজনার পারদ কিছুটা হলেও নামিয়ে আনতে পারে।
হোয়াইট হাউসের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র গত বছরের জুনে রাশিয়ার পাঁচটি ঘাঁটিতে ইউক্রেনের চালানো গোপন ড্রোন হামলা বা ‘অপারেশন স্পাইডারওয়েব’-এর উদাহরণ টেনে বলেন, শত্রুপক্ষ দূর থেকেও কতটা বড় ক্ষতি করতে পারে, এটি তারই প্রমাণ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই সূত্র আরো জানায়, বিষয়টি যা-ই হোক, এটিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গেই বিবেচনা করা হয়েছে।
দ্বিমুখী বার্তা ট্রাম্প প্রশাসনের
বিষয়টি নিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের মন্তব্যের সঙ্গে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর বক্তব্যের স্পষ্ট অমিল লক্ষ করা গেছে। ট্রাম্প ও ভ্যান্স যেখানে সুনির্দিষ্ট একটি হুমকির দিকে ইঙ্গিত করছেন, সেখানে রুবিও বেশ সাবধানে কথা বলেছেন। বিশ্বজুড়ে সামরিক ইউনিট ও সরঞ্জাম অদলবদল করা একটি ‘স্বাভাবিক বিষয়’ বলেই মনে করেন তিনি।
ইংল্যান্ডের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের গ্লুস্টারশায়ারের কটসওল্ডসে অবস্থিত ফেয়ারফোর্ড বিমানঘাঁটির ঘটনাটি বর্তমানে ব্রিটিশ কাউন্টার-টেররিজম বা সন্ত্রাসবিরোধী পুলিশ তদন্ত করছে। এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে প্রথমে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হলেও পরে তাঁরা জামিনে মুক্তি পান। পরবর্তী সময়ে যুক্তরাজ্য ও ইরানের দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকা ষষ্ঠ এক ব্যক্তিকেও গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি বর্তমানে জামিনে রয়েছেন।
প্রথম পাঁচজন মুক্তি পাওয়ার পর এ সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। মার্কিন কর্মকর্তারাও এ ঘটনায় ইরানের হাত থাকতে পারে বলে ইঙ্গিত দেন। তবে ইংল্যান্ডের সরকারি দপ্তরের সূত্রগুলো একটি বিষয়ে দ্বিমত করেনি যে গ্লুস্টারশায়ার ঘাঁটির ওই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির জের ধরেই ওয়াশিংটন বিমানগুলো সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানান, তিনি ফেয়ারফোর্ড ঘাঁটি থেকে বোমারু বিমান সরানোর এ সিদ্ধান্তকে গত সপ্তাহের ঘটনার সঙ্গে সরাসরি মেলাতে চান না। তিনি আরও বলেন, ‘নিয়মিত মহড়া, পুনঃমোতায়েন কিংবা নতুন-পুরোনো বিমানের অদলবদলের অংশ হিসেবে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে সামরিক সরঞ্জাম সরিয়ে নেওয়া কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা নয়।’
যুক্তরাজ্যের ঘাঁটিগুলোর নিরাপত্তাব্যবস্থার ওপর ওয়াশিংটনের পূর্ণ আস্থা রয়েছে এবং ওই ঘটনার পর থেকে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ সর্বোচ্চ সহযোগিতা করছে বলেও জানান রুবিও।
অন্যদিকে ভ্যান্স জানান, ‘অতিরিক্ত সতর্কতার’ অংশ হিসেবেই বিমানগুলো সরানো হয়েছে। ওয়াশিংটন মনে করে, গত ৪৯ বছর ধরে ইরান যা করছে, এটি তারই অংশ—যার মূল লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যদের বিরুদ্ধে ‘সন্ত্রাসী’ কর্মকাণ্ড চালানো।
তবে এতে ইরানের জড়িত থাকার ‘নিরেট প্রমাণ’ রয়েছে বলে উল্লেখ করলেও এ নিয়ে বিস্তারিত কিছু বলেননি যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম। একইভাবে রুবিও এটিকে ‘বিদেশি শক্তির স্পষ্ট হাত’ থাকার ঘটনা বলে বর্ণনা করলেও কোনো বিস্তারিত তথ্য দেননি। তবে তেহরান এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে।
এর আগে গত জুলাই মাসে ইরান স্পষ্ট জানিয়েছিল, ‘ইরানের ভূখণ্ডে আগ্রাসন চালানোর জন্য ব্যবহার করা যেকোনো ঘাঁটিকে বৈধ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে গণ্য করবে তাদের বাহিনী।’
বিবিসি বলছে, ওয়েলফোর্ড গ্রামের কাছে অবস্থিত আরএএফ ফেয়ারফোর্ডকে কয়েক দশক ধরেই মার্কিন বিমান বাহিনী তাদের অগ্রবর্তী ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। ইরানের ওপর হামলার জন্য যুক্তরাজ্যের অনুমতি পাওয়ার পর সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এ ঘাঁটি থেকেই মধ্যপ্রাচ্যের উদ্দেশ্যে বি-১ ও বি-৫২ বোমারু বিমান উড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
প্রতিরক্ষাবিষয়ক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ‘রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের’ গবেষণা বিশ্লেষক ক্রিস্টফ বার্গস রয়টার্সকে বলেন, ফেয়ারফোর্ড থেকে বিমান সরিয়ে নেওয়ায় ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের দ্রুত আকাশপথে হামলা চালানোর সক্ষমতা কিছুটা কমবে, যা সামগ্রিক উত্তেজনার পারদ কিছুটা হলেও নামিয়ে আনতে পারে।
তবে ক্রিস্টফ বার্গস মনে করিয়ে দেন, লন্ডন শুধু প্রতিরক্ষামূলক হামলার জন্য এ ঘাঁটি ব্যবহারের শর্ত দেওয়ায় এমনিতেই এর ব্যবহার সীমিত ছিল। মাঝ আকাশে জ্বালানি নেওয়ার ঝামেলা এড়াতে এ বিমানগুলোকে হয়তো দিয়েগো গার্সিয়া কিংবা পারস্য উপসাগরীয় কোনো ঘাঁটিতে পরে পাঠানো হতে পারে। তবে তা নির্ভর করবে ওই ঘাঁটিগুলোর ধারণক্ষমতা, মিত্রদের সঙ্গে আলোচনা ও নিরাপত্তাব্যবস্থার ওপর।