জামাল উদ্দিন, ক্রাইম রিপোর্টার : রোদের আলোয় চকচক করা রেললাইন দুটো আগের মতোই সোজা হেঁটে গেছে দিগন্তের দিকে। যে জাফরপুর রেলস্টেশন একসময় মানুষের পদচারণা, চায়ের কাপের টুংটাং শব্দ আর হাঁকডাকে দিনরাত গমগম করত, সময়ের নির্মম আবর্তে সেখানে আজ এক ভূতুড়ে নীরবতা। জয়পুরহাটের আক্কেলপুর উপজেলার জাফরপুর রেলস্টেশনটি আজ কেবল এক খণ্ড ইট-কাঠের প্ল্যাটফর্ম নয়, বরং আশপাশের ১০টি গ্রামের হাজার হাজার মানুষের আক্ষেপ আর অবহেলার এক জীবন্ত সাক্ষী।
জাফরপুর, রামশালা, গুনিপুর, হলহলিয়া, কাদোয়া, বিষ্ণুপুর, কাশিরা, গুডুম্বা, পলাশবাড়ী ও হাজরাপাড়া—এই গ্রামগুলোর মানুষের কাছে রেলপথটি একসময় ছিল জীবনের ধমনী। কম খরচে গন্তব্যে পৌঁছানো, ভোরে হাটের পণ্য নিয়ে ট্রেনে ওঠা কিংবা প্রতিদিনের কর্মস্থলে ফেরার সবচেয়ে সহজ মাধ্যম ছিল এই স্টেশন। কিন্তু দিনে দিনে ট্রেনের সংখ্যা কমতে কমতে এখন প্রায় শূন্যের কোঠায় ঠেকেছে। নির্ধারিত সময়ে ট্রেন না আসা আর ন্যূনতম যাত্রীসেবার অভাবে মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছেন সাধারণ মানুষ। স্টেশনে প্ল্যাটফর্ম আছে, টিকিট কাটার কাউন্টার আছে, কিন্তু হারিয়ে গেছে মানুষের কোলাহল আর জীবনের স্পন্দন।
একটি স্টেশন শুধু যাত্রী ওঠানামার জায়গা নয়, এটি একটি অঞ্চলের অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি। জাফরপুরকে কেন্দ্র করে একসময় গড়ে উঠেছিল একাধিক খাবার হোটেল, চায়ের দোকান আর ক্ষুদ্র ব্যবসা। ট্রেনের অপেক্ষায় থাকা যাত্রীদের ভিড়ে জমে উঠত বেচাকেনা।
সেই পুরোনো দিনের স্মৃতি মনে করে স্টেশনের সাবেক হোটেল ব্যবসায়ী আব্দুল জলিল বলেন, একসময় এই স্টেশনে তাঁর বিশাল হোটেল ব্যবসা ছিল, প্ল্যাটফর্ম জুড়ে ছিল মানুষের আনাগোনা। এখন আগের মত ট্রেনের দেখা নেই, যাত্রীও নেই। সংসার চালাতে বাধ্য হয়ে সেই হোটেল ছেড়ে তিনি এখন অটো চালিয়ে দিন পার করছেন। শুধু জলিল নন, স্থানীয় ব্যবসায়ী তোফাজ্জল হোসেনের গল্পটাও একই। নাটোরের নলডাঙ্গা থেকে ট্রেনে করে পেঁয়াজ-রসুন এনে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করতেন তিনি। কম খরচে পণ্য পরিবহনের সেই সুবিধা এখন আর নেই। বিকল্প যানবাহনে কয়েক গুণ বেশি টাকা আর সময় খরচ করে পণ্য আনতে গিয়ে দিশেহারা এলাকার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা।
সোনামুখী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ডি এম রাহেল ইমাম জানান, একসময় জাফরপুর স্টেশনটি ছিল এই এলাকার সামাজিক ও অর্থনৈতিক মেলবন্ধনের কেন্দ্রবিন্দু। তবে সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রশাসনিক সদিচ্ছার অভাবে আজ সেই জমজমাট পরিবেশ পুরোপুরি বিলীন হয়ে গেছে। স্থায়ীদের অভিযোগ, প্ল্যাটফর্মে যাত্রীদের বসার জায়গা নেই, নেই রাতের বেলা পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা। সূর্য ডুবলেই পুরো স্টেশন এলাকা এক অজানা আঁধারে ঢেকে যায়, যা যাত্রী ও পথচারীদের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক।
একটি অঞ্চলের শিক্ষার্থী, কর্মজীবী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ভোগান্তি দূর করতে জাফরপুর রেলস্টেশনটিকে পুনরায় সচল করা এখন সময়ের দাবি। অবিলম্বে নতুন ট্রেনের সংযোগ দেওয়া, কার্যকর যাত্রাবিরতি নির্ধারণ করা এবং জরাজীর্ণ অবকাঠামো সংস্কার করে প্ল্যাটফর্মে যাত্রীবান্ধব পরিবেশ ফিরিয়ে আনা জরুরি। একই সাথে স্টেশনে আলোর ব্যবস্থা ও সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। জয়পুরহাটবাসীর আকুল আবেদন, বাংলাদেশ রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ যেন দ্রুত জাফরপুর রেলস্টেশনের করুণ দশা পর্যালোচনা করে আধুনিক সংস্কারের উদ্যোগ নেয়। মরচে ধরা ওই লোহার লাইনে আবারও বেজে উঠুক ট্রেনের হুইসেল, নিভে যাওয়া স্টেশনে ফিরে আসুক প্রাণের স্পন্দন।