সফল ও শান্তিময় জীবনের জন্য কোরআনের ১০ নির্দেশনা

অনলাইন ডেস্ক : মানুষের জীবনে পরিবর্তন আসে নানা কারণে। কখনো একটি ঘটনা, কখনো একটি উপদেশ, আবার কখনো একটি উপলব্ধি বদলে দিতে পারে জীবনের গতিপথ।

কিন্তু এমন একটি মহাগ্রন্থ রয়েছে, যার প্রতিটি বাণী মানুষের চিন্তা, বিশ্বাস, চরিত্র ও জীবনযাপনে আমূল পরিবর্তন আনার শক্তি রাখে। আর সেটি হলো পবিত্র আল কোরআন। তাই জীবন বদলে দেবে কোরআনের ১০ শিক্ষা নিম্নে তুলে ধরা হলো,
১. হতাশ না হয়ে আল্লাহর রহমতের প্রতি আশাবাদী থাকা

মানুষের জীবনে দুঃখ-কষ্ট, ব্যর্থতা ও পাপের ঘটনা আসতেই পারে। কখনো নিজের ভুলের কারণে, কখনো পরিস্থিতির চাপে মানুষ হতাশ হয়ে পড়ে।

অনেক সময় সে মনে করে, তার আর ফিরে আসার কোনো পথ নেই। অথচ কোরআন মানুষকে হতাশ হতে নিষেধ করেছে এবং আল্লাহর অসীম রহমতের প্রতি আশাবাদী হতে শিখিয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘বলুন, হে আমার বান্দারা! যারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সব গুনাহ ক্ষমা করে দেন। নিশ্চয়ই তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। (সুরা : জুমার, আয়াত : ৫৩)

২. বিপদে ধৈর্য ধরে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা

জীবন কখনো এক রকম থাকে না। সুখের পাশাপাশি দুঃখ, প্রাপ্তির পাশাপাশি অপ্রাপ্তি এবং সুস্থতার পাশাপাশি অসুস্থতাও মানুষের জীবনের অংশ। কিন্তু একজন মুমিনের বিশেষত্ব হলো, সে বিপদে ভেঙে পড়ে না; বরং ধৈর্য ধারণ করে এবং আল্লাহর ওপর ভরসা রাখে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন। (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৫৩)

৩. নিজেকে পরিবর্তন করা

অনেক মানুষ নিজের জীবনের দুরবস্থা, ব্যর্থতা কিংবা প্রতিকূলতার জন্য অন্যকে দায়ী করে। কিন্তু কোরআন মানুষকে প্রথমে নিজের দিকে তাকাতে এবং আত্মসংশোধনে মনোযোগী হতে শেখায়। নিজের চিন্তা, বিশ্বাস, অভ্যাস ও কাজের পরিবর্তন ছাড়া জীবনে প্রকৃত পরিবর্তন আসা কঠিন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেদের অবস্থা নিজেরা পরিবর্তন করে। (সুরা : রাদ, আয়াত : ১১)

৪. সময়ের মূল্য বুঝতে শেখা

মানুষের জীবনে সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদগুলোর একটি হলো সময়। হারানো অর্থ আবার উপার্জন করা সম্ভব, হারানো সম্পদও ফিরে পাওয়া যেতে পারে; কিন্তু একবার যে সময় চলে যায়, তা আর কখনো ফিরে আসে না। অথচ মানুষ জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময়গুলো অনেক সময় অনর্থক কাজে ব্যয় করে। পবিত্র কোরআন সময়ের গুরুত্ব স্মরণ করিয়ে দিয়ে মানুষকে ক্ষতি থেকে বাঁচার পথ দেখিয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘সময়ের শপথ! নিশ্চয়ই মানুষ ক্ষতির মধ্যে রয়েছে। তবে তারা ছাড়া, যারা ঈমান এনেছে, সৎকর্ম করেছে এবং পরস্পরকে সত্যের উপদেশ দিয়েছে ও ধৈর্যের উপদেশ দিয়েছে। (সুরা : আসর, আয়াত : ১-৩)

৫. মা-বাবার সঙ্গে সদাচরণ করা

মানুষের জীবনে মা-বাবার অবদান অপরিসীম। তাঁরা সন্তানের জন্ম থেকে শুরু করে বড় হওয়া পর্যন্ত অসংখ্য ত্যাগ স্বীকার করেন। অথচ অনেক সময় মানুষ বড় হওয়ার পর মা-বাবার প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্য ভুলে যায়। পবিত্র কোরআন আল্লাহর ইবাদতের নির্দেশ দেওয়ার পরপরই মা-বাবার সঙ্গে সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমার প্রতিপালক নির্দেশ দিয়েছেন যে, তোমরা তিনি ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করবে না এবং মা-বাবার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করবে। তাদের একজন অথবা উভয়েই যদি তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হন, তবে তাদের উফ শব্দটিও বলো না এবং তাদের ধমক দিয়ো না; বরং তাদের সঙ্গে সম্মানজনক কথা বলো।’ (সুরা : ইসরা, আয়াত : ২৩)

৬. নিজের সংশোধনে মনোযোগী হওয়া

মানুষের একটি বড় দুর্বলতা হলো, সে নিজের ভুলের চেয়ে অন্যের ভুল বেশি দেখতে পছন্দ করে। অন্যের সামান্য ত্রুটি নিয়ে সমালোচনা করে, অথচ নিজের বড় বড় ভুলগুলো উপেক্ষা করে। এতে সমাজে হিংসা, বিদ্বেষ ও সম্পর্কের অবনতি ঘটে। পবিত্র কোরআন এ ধরনের মানসিকতা পরিহার করার নির্দেশ দিয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনগণ! কোনো সম্প্রদায় যেন অন্য সম্প্রদায়কে উপহাস না করে; হতে পারে তারা তাদের চেয়ে উত্তম। আর নারীরাও যেন অন্য নারীদের উপহাস না করে; হতে পারে তারা তাদের চেয়ে উত্তম। তোমরা একে অপরের প্রতি দোষারোপ কোরো না এবং একে অপরকে মন্দ উপনামে ডেকো না।’ (সুরা : হুজুরাত, আয়াত : ১১)

৭. কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা

মানুষ জীবনে অসংখ্য নেয়ামত ভোগ করে। সুস্থতা, নিরাপত্তা, পরিবার, সন্তান, খাদ্য, পানীয়, অর্থ-সম্পদ—প্রতিটি নেয়ামতই মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে পাওয়া। কিন্তু মানুষ অনেক সময় যা পেয়েছে, তার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ না করে যা পায়নি, তা নিয়েই আফসোস করে। ফলে তার জীবনে অসন্তুষ্টি ও অস্থিরতা তৈরি হয়। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যদি তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো, তবে অবশ্যই আমি তোমাদের আরো বাড়িয়ে দেব। আর যদি অকৃতজ্ঞ হও, তবে নিশ্চয়ই আমার শাস্তি অত্যন্ত কঠিন।’ (সুরা : ইবরাহিম, আয়াত : ৭)

৮. মানুষের প্রতি সদয় হওয়া

মানুষের সঙ্গে চলতে গেলে কখনো ভুল-বোঝাবুঝি, মনোমালিন্য কিংবা কষ্ট পাওয়ার ঘটনা ঘটতেই পারে। কেউ অন্যায় করলে তার প্রতি প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তাকে ক্ষমা করে দেওয়া মহৎ চরিত্রের পরিচয়। পবিত্র কোরআন মানুষকে ক্ষমাশীল ও উদার হতে উৎসাহিত করেছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তারা যেন ক্ষমা করে এবং উপেক্ষা করে। তোমরা কি পছন্দ করো না যে, আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করুন? আর আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সুরা : নুর, আয়াত : ২২)

৯. অন্যের অধিকার রক্ষায় সচেতন হওয়া

মানুষের জীবনে অর্থ-সম্পদের প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু সম্পদ অর্জনের ক্ষেত্রে হালাল-হারামের পার্থক্য ভুলে গেলে সেই সম্পদ মানুষের জন্য কল্যাণের পরিবর্তে অকল্যাণের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই পবিত্র কোরআন বৈধ উপার্জন, ন্যায়সংগত লেনদেন এবং মানুষের সম্পদের অধিকার রক্ষার নির্দেশ দিয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা পরস্পরের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করো না; তবে পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে ব্যবসা হলে ভিন্ন কথা।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ২৯)

১০. জীবনকে আখিরাতের প্রস্তুতির ক্ষেত্র হিসেবে গ্রহণ করা

মানুষ দুনিয়ার জীবনকে কেন্দ্র করে নানা পরিকল্পনা করে। বাড়ি, গাড়ি, সম্পদ, ব্যবসা ও সম্মান অর্জনের জন্য দিনরাত পরিশ্রম করে। অথচ যে আখিরাতের জীবন চিরস্থায়ী, তার প্রস্তুতির কথা অনেক সময় ভুলে যায়। পবিত্র কোরআন মানুষকে দুনিয়া ও আখিরাতের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে এবং পরকালের জন্য প্রস্তুতি নিতে নির্দেশ দিয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ তোমাকে যা দিয়েছেন, তা দিয়ে আখিরাতের আবাস অনুসন্ধান করো। আর দুনিয়া থেকে তোমার অংশ ভুলে যেয়ো না। তুমি অনুগ্রহ করো, যেমন আল্লাহ তোমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন। (সুরা : কাসাস, আয়াত : ৭৭)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *