জয়নাল আবেদীন রাজু, বরগুনা জেলা প্রতিনিধি: বরগুনায় জেলেদের তালিকা প্রণয়নে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও রাজনৈতিক প্রভাবের মারাত্মক অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় জেলেদের দাবি, বিগত সরকারের আমলে প্রকৃত জেলেদের বাদ দিয়ে অ-জেলে ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নাম তালিকাভুক্ত করা হয়েছিল। তবে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও সেই পুরোনো তালিকার বড় অংশ বহাল রয়েছে। এমনকি বর্তমানেও তালিকা হালনাগাদ করতে গিয়ে রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়তে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন মৎস্য বিভাগের সংশ্লিষ্টরা। এর ফলে মাছ ধরাকে একমাত্র জীবিকা হিসেবে নেওয়া অর্ধলক্ষাধিক জেলে পরিবার সরকারি সহায়তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
জেলা মৎস্য বিভাগের তথ্যমতে, বরগুনায় বর্তমানে নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ৫২ হাজার ৪৭৬ জন। তবে স্থানীয় পর্যায়ে নিবন্ধনের বাইরে রয়ে গেছেন আরও অন্তত ৫০ হাজার প্রকৃত জেলে। বছরের পর বছর নদী ও সাগরে জীবন বাজি রেখে মাছ ধরলেও তালিকায় নাম না থাকায় সরকারি কোনো সহায়তা পাচ্ছেন না তারা। বিশেষ করে মা ইলিশ সংরক্ষণের ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা চলাকালে উপার্জন বন্ধ থাকায় চরম অনিশ্চয়তায় পড়েন এসব উপকূলীয় জেলে। সংসারের খাবার জোগাড়, সন্তানদের পড়াশোনার খরচ ও ঋণের কিস্তি মেটাতে গিয়ে বহু পরিবারকে ধারদেনা করে দিন কাটাতে হচ্ছে।
স্থানীয় জেলে ও মৎস্যজীবীদের অভিযোগ, বিগত সরকারের আমলে তালিকা তৈরির সময় প্রকৃত জেলেদের সঠিকভাবে চিহ্নিত করা হয়নি। প্রভাবশালী ব্যক্তি ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের স্বজনপ্রীতির কারণে বহু অ-জেলে কার্ড ও সরকারি সুবিধা পেয়েছেন। মৎস্য বিভাগের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানান, বর্তমানে জেলেদের তালিকা হালনাগাদ করতে গিয়েও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের পছন্দের লোকজনকে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতে চাপ দেওয়া হচ্ছে। ফলে প্রকৃত জেলেদের একটি বড় অংশ এখনো নিবন্ধনের বাইরেই রয়ে যাচ্ছে।
এদিকে বরগুনা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ জিয়া উদ্দিন জানান, চলতি মা ইলিশ সংরক্ষণ অভিযানে গত ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত জেলায় ২৫৯টি অভিযান ও ৬৬টি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়েছে। অভিযানে ৫ লাখ ৫০ হাজার ১০০ মিটার অবৈধ জাল (যার আনুমানিক মূল্য ২ কোটি ৪ লাখ টাকা) এবং ১২৭ কেজি ইলিশ জব্দ করে এতিমখানা ও দুস্থদের মাঝে বিতরণ করা হয়। এ সময় আইন অমান্য করায় ১৮ জনকে কারাদণ্ড, ৮টি নিয়মিত মামলা এবং ১৬ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে।
মৎস্য বিভাগ আরও জানায়, নিষেধাজ্ঞাকালীন নিবন্ধিত জেলেদের সহায়তায় ৯৮৬.৭২৫ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে ইতোমধ্যে ৯৩৯.২২৫ মেট্রিক টন (৯৫.১৯ শতাংশ) বিতরণ শেষ হয়েছে। তবে নিবন্ধনের বাইরে থাকা বিপুল সংখ্যক প্রকৃত জেলে এই চালের সুবিধা থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত রয়েছেন।
রাজনৈতিক প্রভাব ও স্বজনপ্রীতিমুক্ত রেখে অবিলম্বে জেলে তালিকা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে হালনাগাদ করার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী ও সচেতন মহল। তাঁদের মতে, কার্ডধারী জেলেদের প্রকৃত পেশাগত পরিচয় যাচাই করে ভুয়াদের বাদ দিতে হবে এবং বাদ পড়া প্রকৃত জেলেদের নিবন্ধনের আওতায় আনতে হবে। তবেই সরকারি সহায়তার সঠিক বণ্টন নিশ্চিত হবে এবং বঞ্চনার শিকার পরিবারগুলোর দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ লাঘব হবে।